top of page

এলএনজি ঘিরে বড় ঋণের ফাঁদ

Sep 20, 2026

| মোফাজ্জল বিদ্যুৎ

মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়নের আওতায় শিল্প, বিদ্যুৎ ও বন্দর—এই তিন অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মহাপরিকল্পনায় বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এতে একদিকে বড় অঙ্কের ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ও সরবরাহের অস্থিরতার সঙ্গে দেশের শিল্প ও অর্থনীতি আরও বেশি জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।


সরকারের দাবি, মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বন্দরে পণ্য পরিবহনের খরচ ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমবে, শিল্পাঞ্চলজুড়ে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং বছরে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। তবে এসব সম্ভাব্য সুফলের বিপরীতে এলএনজিনির্ভর অবকাঠামো, বৈদেশিক ঋণ, সুদ, সক্ষমতার অর্থ পরিশোধ ও আমদানি ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি দায় কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।


কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে ৩০ বছরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৬০ থেকে ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে। এর বড় একটি অংশ ঋণের মাধ্যমে অর্থায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের দায়ও বাড়তে পারে।


২০২৫ সালের নভেম্বরে ‘মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ: বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে জাপানের আরেক ধরনের আধিপত্য’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশ করে ক্লিন। প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু ন্যায়বিচার, পরিবেশগত জবাবদিহিতা ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে কাজ করছে।


গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাপরিকল্পনায় এলএনজি ও সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার বিকল্পের মধ্যে এলএনজিকেন্দ্রিক ব্যবস্থাকে বেছে নেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরকারি ভর্তুকির চাপ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাবদ বিপুল অর্থ পরিশোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।


ক্লিনের হিসাবে, মাতারবাড়ী মহাপরিকল্পনার আওতায় প্রস্তাবিত এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাবদ বছরে প্রায় ২৬১ কোটি মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হতে পারে। ২০ বছরের হিসাবে এই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৫৭৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারে দাঁড়াতে পারে। একইসঙ্গে এলএনজি গ্রহণ ও সরবরাহের জন্য নির্মাণ করা টার্মিনালের সক্ষমতা বাবদ বছরে প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হতে পারে। ২০ বছরে এ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮০ কোটি ডলার।


এলএনজি আমদানির ব্যয়ও ভবিষ্যতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ক্লিনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশের বার্ষিক ব্যয় ৭ থেকে ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর চাপের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের জন্য এত বিপুল অর্থ জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় করা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।


এলএনজির ওপর নির্ভরতার প্রভাব ইতোমধ্যে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির মধ্যেও দেখা যাচ্ছে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতার কারণে ২০২৩ সালে সরকার গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়। এতে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে এবং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয়ও বাড়ছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানির জন্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বা ৭৩ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি খাতে সরকার প্রায় ৬ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা বা ৫২ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিয়েছে। মাতারবাড়ীতে এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে এই ভর্তুকির বোঝা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছে ক্লিন।


১৩,৫০০ মেগাওয়াটের এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র

মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনায় তিনটি অঞ্চল—শিল্প, বিদ্যুৎ ও বন্দর গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। বিদ্যুৎ অঞ্চলে ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।


ক্লিনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মেহেদী এ পরিকল্পনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জাতীয় অর্থনীতিকে তিনি বলেন, সোলার ও উইন্ড বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকা উপযোগী হওয়া সত্ত্বেও সেখানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


হাসান মেহেদী বলেন, পরিকল্পনার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, সোলার ও উইন্ড বিদ্যুৎ বাস্তবায়ন করলে তা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ব্যবসা তৈরি করে দেবে। এ কারণে সোলার প্রকল্প করা যাবে না—এমন যুক্তি দেখানো হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘ইজ ইট এ প্ল্যান, নাকি পলিটিক্স?’


গবেষণায় বলা হয়েছে, এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিবর্তে বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার বাড়ানো এবং দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বিনিয়োগ করলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। আন্তর্জাতিক জ্বালানি অর্থনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, শুধু শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো গেলে বছরে প্রায় ৪৬ কোটি মার্কিন ডলারের এলএনজি আমদানি কমানো সম্ভব।


ক্লিনের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণে যে বিপুল মূলধন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে তা বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন, শিল্পে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বিনিয়োগ করা হলে বেশি অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে।


তবে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) পরিকল্পনায় জ্বালানির চাহিদা কমানো ও দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে বড় অবকাঠামো নির্মাণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় সুবিধা পেতে পারে বলেও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।


অতিরিক্ত অবকাঠামোর ঝুঁকি

সরবরাহনির্ভর এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, অতিরিক্ত এলএনজি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে এসব প্রকল্প প্রত্যাশিত ব্যবহার না পেয়ে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। এতে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রভিত্তিক জ্বালানি অবকাঠামোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।


বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ব যখন কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে তখন এলএনজিভিত্তিক অবকাঠামোর জন্য বিপুল ঋণ নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক এসব অবকাঠামোর ব্যবহার কমে গেলে সেগুলো অচল বা অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর সম্পদে পরিণত হতে পারে। কিন্তু এসব প্রকল্পের ঋণের আসল অর্থ পরিশোধের দায় থেকে যাবে।


অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ক্রমান্বয়ে জাইকার ঋণের সুদের হার বাড়ছে। ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত জাইকার ঋণের সুদের হার বেড়ে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হয়েছে। মূল অর্থ পরিশোধের দীর্ঘমেয়াদি দায়ের সঙ্গে সুদের বোঝা যুক্ত হলে তা জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।


গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, জাপান গত কয়েক বছরে তাদের সুদের হার ব্যাপক পরিবর্তন করেছে। জাইকার সর্বশেষ সুদের হার ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরের পর জাইকা আবার সুদের হার বাড়াবে এবং প্রতি চার মাস পরপর তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।


নবায়নযোগ্য জ্বালানির পক্ষে বিশেষজ্ঞরা

দেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতের চাহিদা মেটাতে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান। তার মতে, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনে মাতারবাড়ীতে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের প্রয়োজন হলেও সরকারের ওপর নতুন করে আর্থিক দায় যাতে না বাড়ে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।


জাতীয় অর্থনীতিকে এম জাকির হোসেন খান বলেন, অতীতে জনগণের অর্থ কিংবা ঋণে বাস্তবায়িত একাধিক প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়, দুর্নীতি ও অস্বাভাবিক দেনার যে বোঝা তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাইবাছাই করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।


তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির স্বাভাবিক চাকা সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অপরিহার্য। তবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল হলে তা বড় অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি দিয়ে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। তার মতে, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে সরকারের নতুন করে আর্থিক চাপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত।


এদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসার পক্ষে মত দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।


তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, এলএনজির তুলনায় দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস বিকল্প হিসেবে বেশি কার্যকর। এ খাতে সরকারি ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। সরকার যেহেতু ইতোমধ্যে গ্যাস খাতে কাজ করছে, প্রয়োজন অনুযায়ী এ বিনিয়োগ আরও বাড়ানো দরকার।


খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মহেশখালী সমুদ্রের কাছে অবস্থিত হওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্য ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক। বিশেষ করে ওই এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ ও গ্রাউন্ড-মাউন্টেড সোলার প্রকল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য কয়লা ও এলএনজিনির্ভরতা কমিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে নবায়নযোগ্য ও বিকল্প জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


News Link: এলএনজি ঘিরে বড় ঋণের ফাঁদ

bottom of page