top of page

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

Feb 3, 2026

| হাসান মেহেদী

দেড় দশক পর দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে বিজয়ী দল বা জোট একটি নতুন সরকার বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। ঘৃণাবাদ ও ভেঙে পড়া শিষ্টাচার, সর্বস্তরে জেঁকে বসা দুর্নীতি, গতি হারানো অর্থনীতি আর ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতে নতুন সরকার এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আওয়ামী সরকার শতভাগ এলাকা বিদ্যুতের আওতায় আনার ঘোষণা দিলেও নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। জ্বালানি খাতে ক্রমশ আমদানি-নির্ভরতা বেড়েছে, বেড়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের দায়।


জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি, স্বজনতোষণ ও অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে বিদ্যুৎ খাতে স্থাপিত ক্ষমতা ছিল ৫ হাজার ৩০৬ মেগাওয়াট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পাঁচ গুণ বেড়ে ২৭ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। অথচ, এ বছর শীর্ষঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল মাত্র ১৬ হাজার ৬০৩ মেগাওয়াট। ফলে ১০ হাজার ৮১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অলস পড়ে রয়েছে যা মোট চাহিদার ৬৫ শতাংশ। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রাক্কলন অনুসারে আগামী ২০৩৫ সালে সর্বোচ্চ চাহিদা ২৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে। তাই ২০ শতাংশ রিজার্ভ রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অতিরিক্তি বিদ্যুৎকেন্দ্র অবসরে পাঠানো হবে নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ।


জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে শুধুমাত্র অলস সম্পদের দায় বাড়ে, এ বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষা করে পূর্ববর্তী সরকার আমদানিনির্ভর এক জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়নি। ২০২২ সালের শুরুতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিদ্যুৎ খাতের দম বন্ধ হওয়ার দশা হয়ে যায়। অর্থনৈতিক মন্দা ও ডলার ঘাটতির কারণে জ্বালানি-সংকট দেখা দেয়, তার সঙ্গে বৃদ্ধি পায় আমদানি-নির্ভরতা। ২০১৭-১৮ সালে যেখানে আমদানি-নির্ভরতার হার ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০২৪-২৫ সালে তা ৬২ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানির চাহিদা পূরণের জন্য অর্থসংস্থানের পাশাপাশি আগামীতে আমদানি-নির্ভরতা কমানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।


জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সব থেকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তটি ছিল এলএনজি আমদানি। স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাদ দিয়ে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও আমদানির কারণে রিজার্ভে অপূরণীয় ছিদ্র তৈরি হয়ে গেছে। প্রতি ঘনমিটার আমদানিকৃত গ্যাস ৭২-৭৮ টাকায় কিনে ১৫-১৬ টাকায় বিক্রি করার কারণে প্রতি বছর লোকসান হচ্ছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এই আত্মঘাতী পরিকল্পনারই সমন্বিত রূপ মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা (মিডি মাস্টার প্ল্যান)। এটা সমর্থন করেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) গঠন করেছে। এ পরিকল্পনা বাতিল করে সবুজ জ্বালানির দিকে গতিপথ পাল্টানোটা আরেকটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসতে পারে।


জ্বালানি আমদানিতে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা দরকার, তেমনি পুরোনো দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধ করাও জরুরি। নাগরিকদের তীব্র বিরোধিতার মুখে নির্মিত রামপাল, পায়রা, পটুয়াখালী ও মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সরকারের ওপর এসব ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায় বর্তায়। এছাড়া ঋণের আওতায় নেওয়া হয়েছে পদ্মা রেল সেতু, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পায়রা বন্দরের মতো বিলাসী প্রকল্প। কিছু কিছু ঋণের কিস্তি সবেমাত্র শুরু হয়েছে অথবা খুব শিগগিরই শুরু হবে। সময়মতো এসব ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাটা হবে চতুর্থ বড় চ্যালেঞ্জ।


জ্বালানি খাতের সংকট এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে তাতে জ্বালানি সরবরাহ করাই যথেষ্ট হবে না। অস্বচ্ছ চুক্তিগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝাও রয়েছে। বিগত ১৮ বছরে এ খাতে জনগাণের ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি ক্রনি ক্যাপিটালিস্টের হাতে। এসব টাকার বড় একটা অংশ বিদেশে চলে গেছে। গুরুতর দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ছাড়া বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) বাতিল করা সম্ভব নয়। তাই, প্রতিটি চুক্তি পর্যালোচনা করে প্রকৃত খরচ নির্ধারণ করে ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্নির্ধারণ করার পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে হবে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান ক্যাপাসিটি চার্জও পরিশোধ করতে হবে।


ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ, মাথাভারী প্রশাসন পরিচালনা এবং দুর্নীতির কারণে প্রতি বছর পরিচালন ব্যয় বাড়তে বাড়তে লোকসানের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। সরকারি ভর্তুকিসহ বিগত ১৮ বছরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি ২ লাখ ৫১ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা লোকসানের শিকার হয়েছে। এই লোকসান কমাতে গিয়ে ১৮ বছরে রাজস্ব আয় থেকে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ভর্তুকি দেওয়ার পরও নেট লোকসানের পরিমাণ রয়ে গেছে ৭৪ হাজার ৫৫০ কেটি টাকা। এভাবে ধীরে ধীরে এটি একটি খেলাপি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে গেছে। এখান থেকে বিপিডিবিকে টেনে তোলা হবে সরকারের ষষ্ঠ বড় চ্যালেঞ্জ।


বিপিডিবির বর্তমান কাঠামোর মধ্যে গুরুতর স্বার্থের সংঘাত রয়েছে যা এর দক্ষতা কমিয়ে লোকসান বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিপিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের দায়িত্ব বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে এটিকে প্রকৃত রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। পরিকল্পনার আওতায় কয়েকটি সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি গঠনের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য দুটি কোম্পানি গঠন করা হয়। কিন্তু এখনও চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ-ব্যবস্থা বিপিডিবির হাতে রয়ে গেছে। এছাড়া দেশের মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রর প্রায় ৩০ শতাংশের মালিক বিপিডিবি। দায়িত্ব কমিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে দায়মুক্ত করা নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।


জোরেসোরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রবর্তন করলে এ খাতে আমদানি-নির্ভরতা কমানো যেতে পারে। ২০০৮ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি দিলেও অর্থ বরাদ্দ না করায় প্রকৃত উৎপাদন এখনও ২ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নবয়ানযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ প্রণয়ন করেছে। নতুন দরপত্রের আওতায় সৌরবিদ্যুতের দাম কমে প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪৬ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। তাই, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অন্তত ৩০ শতাংশে বৃদ্ধি করা দরকার। বিগত সরকারের শাসনামলে অধিগ্রহণকৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের দরপত্র দিলে তা আরও সাশ্রয়ী হবে। দ্রুততার সঙ্গে নতুন সৌর ও বায়ু-বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও চালু করার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা হবে আরেকটি চ্যালেঞ্জ।


২০০৪ সালে দেশে সর্বশেষ জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা হয়। কোনো নীতি ও সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই বিগত ১৮ বছরে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ অনুসারে একের পর এক জ্বালানি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। বিদেশি অর্থায়নে বিদেশি পরামর্শক দিয়ে প্রণীত এসব মহাপরিকল্পনা অতি-সক্ষমতার জটিল এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক স্বপ্ন দেখা ভালো, তবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে প্রতিটি সিদ্ধান্ত হাজার কোটি টাকা লাভ বা লোকসান বয়ে আনতে পারে। তাই, এক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ, খাতভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের বিশ্লেষণ বিবেচনায় রাখা দরকার। ইতোমধ্যে জ্বালানি আমদানিতে প্রাধান্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আরেকটি জ্বালানি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এসব পরিকল্পনা নতুন সরকারের ঘাড়ে বোঝা হয়ে দেখা দিতে পারে।


২০১৭ সালে নাগরিক মতামত উপেক্ষা করে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে ২৫ বছরমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করা হয়। সাংবাদিক ও নাগরিক সংগঠনগুলো এ চুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো উত্থাপন করায় তাদের নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রতি বছর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ খরচ হয়ে যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে লড়াই করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাজ্যের একটি আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে। সালিশি আদালতে বাংলাদেশ জিতুক, সেটা সবাই চাই। কিন্তু এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে জ্বালানিবিষয়ক যে কোনো চুক্তি করার আগে মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা সরকারের জন্য দশম চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসতে পারে।


তবে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, তথ্যের অধিকার, সব পক্ষের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক মতামতের প্রাধন্য দিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব এবং এর উদাহরণ আমাদের দেশেই আছে। তাই, আগামী সরকার একটি সবুজ জ্বালানির দিকে রূপান্তরে সক্ষম হবে বলে আশা করছি।


সংবাদ লিঙ্ক: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

bottom of page