

Jan 18, 2026
| আদিবা - ডেক্স রিপোর্ট
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাবিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬–২০৫০) অবিলম্বে স্থগিত ও বাতিলের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন। তাদের অভিযোগ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, জনসম্পৃক্ততা ও স্বচ্ছতা উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে এই দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে।
রবিবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)। এতে সহ-আয়োজক হিসেবে যুক্ত ছিল ক্লিন, বেলা, সিইপিআর, এমজেএফ, লিড এবং **ইটিআই বাংলাদেশ**সহ একাধিক সংগঠন।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উপেক্ষার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব মূলত একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন এবং জরুরি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সচল রাখা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী।
তারা অভিযোগ করেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ বা জনশুনানি আয়োজন করা হয়নি। বিশেষ করে নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশ সংগঠনগুলোর মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ সীমিত
বক্তারা বলেন, প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’ বা জ্বালানি রূপান্তরের কথা বলা হলেও বাস্তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ১৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এর বিপরীতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সালেও এলএনজি, কয়লা ও তেলের মতো আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ নির্ভরতা বজায় থাকবে। বক্তাদের মতে, এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনায় হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া ও কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিএস) প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কথা বলা হয়েছে। বক্তারা এসব প্রযুক্তিকে ব্যয়বহুল, পরীক্ষামূলক এবং বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
তাদের আশঙ্কা, এসব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে এবং শিল্পখাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর।
পূর্ববর্তী সরকারের নীতির পুনরাবৃত্তির অভিযোগ
বিডব্লিউজিইডির সদস্যসচিব হাসান মেহেদী বলেন, “জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মহাপরিকল্পনা জনশুনানি বা উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি পূর্ববর্তী সরকারের অস্বচ্ছ ও একতরফা নীতি প্রণয়নেরই পুনরাবৃত্তি।”
তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দেশের জনগণকে বহু বছর ধরে বহন করতে হয়। তাই এই ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়নে সর্বস্তরের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
নির্বাচনের প্রাক্কালে পরিকল্পনা নিয়ে হতাশা
লিডের গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনউজ্জামান বলেন, “নির্বাচনের প্রাক্কালে নাগরিক সমাজকে উপেক্ষা করে একই ধরনের একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা অত্যন্ত হতাশাজনক।” তিনি বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার ছাড়া এমন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কী চান নাগরিক সমাজ
সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলো স্পষ্টভাবে দাবি করে—
প্রস্তাবিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা অবিলম্বে স্থগিত ও বাতিল করতে হবে
নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক প্রক্রিয়ায় নতুন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে
পরিবেশ, জলবায়ু ও জনস্বার্থকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে হবে
বক্তারা বলেন, জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত কেবল প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক নয়, এটি সরাসরি জনগণের জীবনমান, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে জড়িত। তাই এই বিষয়ে কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নয়, বরং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে পথ নির্ধারণ করাই হবে টেকসই উন্নয়নের একমাত্র উপায়।
সংবাদ লিঙ্ক: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৬–২০৫০ বাতিলের দাবি নাগরিক সমাজের