

Jan 18, 2026
| বাঙলা প্রতিদিন প্রতিবেদক
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) অনুমোদনের পথে পা বাড়াতেই আজ রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি সংগঠন। সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬–২০৫০) নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনাটি (২০২৬–২০৫০) গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশ ও সমাজের প্রভাব পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা হয়নি এবং জনগণের অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিগণ।
বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)-এর উদ্যোগে এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), আমরাই আগামী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ (সিইপিআর), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই বাংলাদেশ), জেট-নেট বিডি, লয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড), মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ), রি-গ্লোবাল, সৌহার্দ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন, সেইফটি অ্যান্ড রাইটস (এসআরএস), ওয়াটারকিপার্স ও শ্রমিক-নেতৃত্বাধীন ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ওয়ার্কার ক্যান)-এর সহ-আয়োজনে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন, উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)-র নেটওয়ার্ক এডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল কেবল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন জ্বালানি পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
মূল বক্তব্য উপস্থাপনের সময় তিনি বলেন, “যেভাবে অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ব্যবহার করে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, ইপিএসএমপি ২০২৫ সেই একই পথে ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে। বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা ৪০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হবার কথাই না।” তিনি আরো বলেন, মহাপরিকল্পনায় “এনার্জি ট্রানজিশন”-কে ব্যপক প্রচার করা হলেও বাস্তবে প্রকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ সেখানে মাত্র ১৭%, যেখানে কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪%। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫.৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫.২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
২৫ বছর পরও এলএনজি , কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা ৫০% থাকবে- যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচার (সিসিএস)– এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয় এবং ভবিষ্যতে দেশকে নতুন ঋণ, ভর্তুকি ও পরিবেশগত সংকটে ফেলবে।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কার্বন নির্গমন হবে ১৮৬.৩ MtCO₂e, যা দেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি)-এর লক্ষ্য এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গে এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে বিরোধী।
পাশাপাশি শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায্যতা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পোশাক খাতের সবুজায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিকল্পনায় প্রায় উপেক্ষিত রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে, বিডব্লিউজিইডি এর সদস্য সচিব হাসান মেহেদী জানান, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনাটি (২০২৬–২০৫০) প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনসাধারণ, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো ধরনের জনশুনানি বা উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নেরই পুনরাবৃত্তি।”
লিডের গবেষণা পরিচালক এডভোকেট শিমনউজ্জামান বলেন, “নির্বাচনের ঠিক আগ মূহূর্তে, নাগরিক সমাজকে উপেক্ষা করে একই ধরনের (আইইপিএমপি ২০২৩ এর মতো) মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন সত্যিই হতাশাজনক”।
ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ এর পরিচালক (প্রোগ্রাম এভিডেন্স অ্যান্ড লার্নিং) মুনীর উদ্দীন শামীম বলেন, “নাগরিক হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এ ধরনের মহাপরিকল্পনা নাগরিক হিসেবে আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি যদি এভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে রপ্তানি খাত চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ২০২৭ সালের পর আমাদের নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।”
এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন জেটনেট-বিডি এর ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক (সিডিইউ) ওয়াসিউর রহমান তন্ময় এবং ওয়াটারকিপার্সের ম্যানেজার সৈয়দ তাপস প্রমুখ।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, এই খসড়া পরিকল্পনায়-
১) বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা অতিমাত্রায় বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপাবে।
২) পরিকল্পনাটি এখনও প্রধানত আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি (এলএনজি, কয়লা, তেল)-এর ওপর নির্ভরশীল। পরিকল্পনায় ২০৫০ সাল পর্যন্ত আমদানিকৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর ৫০% নির্ভরতা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে । এই বিশাল আমদানির ব্যয় মেটাতে দেশের অর্থনীতির ওপর প্রায় ১৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল আর্থিক বোঝা চাপবে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
৩) নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতার সম্ভাবনাকে প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিতভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
৪) কার্বন নির্গমন হ্রাস, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার প্রশ্নে পরিকল্পনাটি বাংলাদেশের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৫) অতীতে প্রণীত মাস্টার প্ল্যানগুলোর ভুল পূর্বাভাস ও ব্যর্থতার যথাযথ সমালোচনামূলক মূল্যায়ন ছাড়াই আবারও একই ধরনের ভুল পথে এগোনোর ঝুঁকি এতে রয়ে গেছে।
৬) এই পরিকল্পনায় এমোনিয়া ও হাইড্রোজেনের মত প্রযুক্তিকে অপ্রমাণিত বলার পরেও ভবিষ্যৎ এ এই জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
৭) পূর্ববর্তী সমন্বিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় ওয়েভ এনার্জিকে বাংলাদেশে অসম্ভব উল্লেখ করা হলেও এই খসড়া পরিকল্পনায় এটি যুক্ত করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে জোরালো দাবি:
অবিলম্বে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) স্থগিত এবং সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করতে হবে।
প্রতিটি খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে, বাস্তবসম্মত ১০০% নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
ন্যায্য, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
জনগণের নব-নির্বাচিত সরকার কর্তৃক নাগরিক সমাজ ও জনগণের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
অন্যথায়, খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ বাংলাদেশের জন্য আরেকটি জনগণবিচ্ছিন্ন ও অস্বচ্ছ নীতিনথিতে পরিণত হবে, যার দায়ভার শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে দেশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। এই ত্রুটিপূর্ণ, আমদানিনির্ভর ও পরিবেশবিরোধী পরিকল্পনা কার্যকর হলে আগামী কয়েক দশক ধরে জনগণকে চড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মূল্য, বাড়তি কর ও ভর্তুকির চাপ এবং অপূরণীয় পরিবেশগত ক্ষতির খেসারত দিতে হবে।
সংবাদ লিঙ্ক: জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা বাতিলের জোর দাবি বিডব্লিউজিইডির