top of page

নতুন তিন বা চার এলএনজি টার্মিনালের বাস্তবতা ও করণীয়

Aug 29, 2026

| হাসান মেহেদী

গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং ১৩ আগস্ট সামিট গ্রুপের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এরপর দেশে এলএনজি আমদানির নানা আইডিয়া গণমাধ্যমে আসতে শুরু করে। বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ও জ্বালানি সংকট দেখা দিলে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের দায়িত্ব বেসরকারি খাতে দিয়ে দেওয়ার উদ্ভট আইডিয়া সামনে আনা হয়। এ জন্য একটি নীতিমালাও তৈরি করা হয় (জ্বালানি বিভাগ, ২০২৩)। বেসরকারি কোম্পানিগুলো কখনই ল্যান্ডিং স্টেশন (সিটিএমএস) থেকে শুরু করে বিপণন পাইপলাইন নির্মাণ করে এ ব্যবসা করতে চাইবে না। ফলে নীতিমালাটি এখন সচিবালয়ে ধুলো খাচ্ছে।


এ ধরনের আরেকটি আইডিয়া সম্প্রতি সামনে এসেছে। মালয়েশিয়া থেকে আইএসও কনটেইনারে এলএনজি আমদানি করে কারখানা বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হবে। কারখানা বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহকৃত এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে (রিগ্যাসিফিকেশন) ব্যবহার করা হবে (যুগান্তর, ৪ আগস্ট ২০২৬)। এ উদ্যোগ নিলে প্রত্যেক কারখানা বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে একটি ফ্লুইড বা এয়ার ভ্যাপারাইজার লাগবে। একটি ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার এলএনজি ভ্যাপারাইজারের দাম কমপক্ষে আড়াই লাখ ডলার। কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ ধরনের ভ্যাপারাইজার কেনার আগ্রহ, প্রয়োজনীয় সংখ্যা, স্থাপন ও চালানোর লোকবল, পরিচালন ব্যয় এসব না ভেবেই একটি আইডিয়া ছুড়ে দেওয়া তুঘলকি কাণ্ডের মতোই।


এমনই আরেক পরিকল্পনার কথা বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী। গত ১৩ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকার হিরণ পয়েন্ট, মোংলা ও পায়রায় নতুন তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল করার পরিকল্পনা করছে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে এগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হবে (জাতীয় অর্থনীতি, ১৩ আগস্ট)। ইতোপূর্বে ২৮ জুলাই মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে (বণিক বার্তা, ২৯ জুলাই ২০২৬)। সমস্যা জ্বালানি সংকট, এলএনজি সংকট নয়। সমস্যার গোড়ায় হাত না দিয়ে উপরে মালিশ করায় তাৎক্ষণিক ক্ষোভ উপশম হতে পারে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা যে শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে এটা অনুধাবন করা জরুরি।


মন্ত্রী মহোদয় সত্যিই বলেছেন যে, বর্তমান সংকটের সমাধান করতে দুই বছরের মতো লাগবে (প্রথম আলো, ১৬ আগস্ট)। তিনি একইসঙ্গে যদি বলতেন অতিদ্রুত গ্যাস বয়লারগুলো বিদ্যুতে রূপান্তরে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে বাসাবাড়িতে এলপিজি সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, সব আবাসিক ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, নির্মাণাধীন সৌর-বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে অথবা স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনে বাপেক্সের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সত্যিকার অর্থে একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে বলা যেত।


কিন্তু মন্ত্রী এমন পথ বেছে নিলেন যা বাস্তবায়ন করলেও ক্ষতি, না করলেও ক্ষতি। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও জাতীয় পাইপলাইনে সংযোগ স্থাপনে কমপক্ষে আড়াই বছর সময় দরকার। ২০১৬ সালের জুনে এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে এ টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। সরকার এখনই চুক্তি স্বাক্ষর করলে, পরিবেশগত সমীক্ষা, সিটিএমএস নির্মাণ, টার্মিনাল স্থাপনসহ কুতুবজোমের এলএনজি টার্মিনাল ২০৩০ সাল নাগাদ চালু করা যাবে। কার্যকর উদ্যোগ নিলে ততদিনে বাংলাদেশের এলএনজি চাহিদাই শূন্যে নামিয়ে আনা যায়। এদিকে কুতুবজোমের জেলেপল্লীতে ইতোমধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে (জাতীয় অর্থনীতি, ১৫ আগস্ট ২০২৬)।


এবার হিরণ পয়েন্ট এলএনজি টার্মিনাল। মোংলা বন্দর থেকে হিরণ পয়েন্টের দূরত্ব নদীপথে ১৩১ কিলোমিটার, সরাসরি ৭৫ কিলোমিটার। মোংলার নিকটতম জাতীয় পাইপলাইন খুলনায় অবস্থিত যা আরও ৪৫ কিলোমিটার দূরে। শতাধিক নদী ও খাল, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও বিশ্বঐতিহ্য স্থানের মধ্য দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের পরিবেশগত সমীক্ষা, ইউনেস্কোর অনুমোদন, আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী ও জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশের চাপ সামলে, অর্থায়ন জোগাড় করে যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে কতদিন লাগবে সে সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা থাকলেই বলা যায় যে, এ প্রকল্পটি কল্পনা থেকে পরিকল্পনা পর্যন্ত আনাই কঠিন।


একই কথা মোংলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মোংলা সমুদ্র বন্দরের পশুর নদীতে পর্যাপ্ত নাব্য না থাকায় অধিকাংশ বড় জাহাজ সুন্দরবনের হারবাড়িয়ায় অবস্থান করে। সেখান থেকে লাইটার কার্গোতে আমদানীকৃত মালামাল বন্দরে আনা হয়। মোংলা বন্দরে এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এলএনজি কার্গো বঙ্গোপসাগর থেকে কী করে টার্মিনালে গ্যাস সরবরাহ করবে তার কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। মোংলা বন্দর সুন্দরবন থেকে মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বন্দর থেকে আরও সাত কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাবে সুন্দরবনের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও বিরোধী দল উভয়েই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করেছেন। এখন সরকার কি তার পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে ফেলে আওয়ামী লীগের পথই অনুসরণ করবে?


সবশেষে পায়রা এলএনজি টার্মিনাল প্রসঙ্গ। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৭ সালে পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। সেই এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভর করেই ২০১৭ সালের নভেম্বরে জার্মানির সিমেন্স এনার্জির সঙ্গে যৌথভাবে একটি ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তিও স্বাক্ষর করা হয়। ২০২১ সালে পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে রামনাবাদ চ্যানেলে পর্যাপ্ত নাব্য না থাকায় এলএনজি কার্গো ভিড়তে পারবে না। ড্রেজিং করে বা লাইটারেজ ব্যবহার করে এলএনজি আমদানি করায় লাভের থেকে লোকসান বেশি হবে। ফলে পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে আসে তৎকালীন সরকার।


পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করলেই ঢাকা, মেঘনাঘাট বা গাজীপুরের কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করা যাবে— এমন নয়। পায়রা থেকে বরিশাল শহরের দূরত্ব ১০৬ কিলোমিটার। বরিশাল থেকে নিকটতম শহর খুলনার দূরত্ব ১১৫ কিলোমিটার এবং মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পয়েন্টের দূরত্ব ১৩৬ কিলোমিটার। পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল, সিটিএমএস এবং নতুন ২২১ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করে ঢাকায় গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাতের সক্ষমতার বাইরে।


ইতোপূর্বে ২০২২ সালে ভোলা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢাকায় গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নদীর তলদেশ বা সেতুর সঙ্গে পাইপলাইন স্থাপনের খরচের কথা ভেবে সরকার পিছিয়ে আসে। এরপর ২০২৪ সালে এলএনজিতে রূপান্তর করে ভোলা থেকে ঢাকায় গ্যাস সরবরাহ করার পরিকল্পনা করা হয়। অত্যধিক খরচের কারণে সেটিও বাতিল করা হয়। নদীর তলদেশে পাইপলাইন স্থাপনে বিপুল খরচ হয় বিধায় আজ পর্যন্ত ভোলা থেকে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার দূরে বরিশাল শহরেও গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। তাই আকাশকুসুম কল্পনা যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কোনো সুবিধা বয়ে আনবে না তা দ্রুততার সঙ্গে বাতিল করা উচিত।


বরং বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধান নিয়ে আলাপ হওয়া দরকার। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং যত দ্রুত সম্ভব এ সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন (জাতীয় অর্থনীতি, ১৫ আগস্ট ২০২৬)। প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছে বিকল্প প্রস্তাবও চেয়েছেন। ইতোমধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। সেসব প্রস্তাবের কোনো তুল্যবিচার না করেই কয়েকটি অগ্রাধিকারের কথা বলা যায়:


প্রথমত, সব আবাসিক ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে জাতির উদ্দেশ্যে আহ্বান জানাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী সরলভাবে আহ্বান জানালে হাজার হাজার মানুষ উৎসাহিত হবে।


দ্বিতীয়ত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের আমদানি শুল্ক, কর ও ভ্যাট সবার জন্য মওকুফ করতে হবে।


তৃতীয়ত, যত দ্রুত সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি কার্যকর করতে হবে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অবিলম্বে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য যৌক্তিক সঞ্চালন ও বিতরণ হুইলিং চার্জ নির্ধারণ করবে।


চতুর্থত, বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে এলপিজি ও বৈদ্যুতিক রান্নায় উৎসাহিত করতে হবে। যে ভর্তুকি এলএনজি আমদানিতে দেওয়া হয় তার ভগ্নাংশ দিলেও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এলপিজি সাশ্রয়ী হয়ে যাবে।


পঞ্চমত, শিল্পকারখানায় গ্যাস বয়লার ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে। বৈদ্যুতিক বয়লার ব্যবহার করার জন্য সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ দিতে হবে।

ষষ্ঠত, নির্মাণাধীন সৌর ও বায়ু-বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে চুক্তি অনুযায়ী যথাসময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য তাগিদ দিতে হবে। অন্যথায় দৈনিক জরিমানা ও প্রকল্প বাতিল করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


সপ্তমত, আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির, বিশেষত কয়লা ও এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে এমন যেকোনো নতুন প্রকল্প প্রস্তাব বাতিল করতে হবে।


দীর্ঘ দেড় দশকের জীবাশ্ম-জ্বালানিভিত্তিক, অগণতান্ত্রিক, প্রতিযোগিতাহীন ও স্বজনতোষী চর্চার চূড়ান্ত ফলাফল এই জ্বালানি সংকট। আওয়ামী লীগের মতো একই ধরনের চর্চার মাধ্যমে এ সংকটের সমাধান করা প্রায় অসম্ভব। এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্য দরকার সব নাগরিকের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিটি ঘর থেকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া। কেবলমাত্র নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের মধ্য দিয়েই সেটি সম্ভব।


সদস্য সচিব, বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)


News Link: নতুন তিন বা চার এলএনজি টার্মিনালের বাস্তবতা ও করণীয়

bottom of page