top of page

নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের আহ্বান তিন সংগঠনের

Jul 4, 2026

| ক্রাইম বিডি ডেস্ক

নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন অবস্থায় রয়েছে, দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল এবং পরিবেশবিধ্বংসী প্রকল্প হিসেবে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এর দ্বারা আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই সংগঠনগুলো অবিলম্বে প্রকল্পটি বাতিলের আহ্বান জানায়।


শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানী ঢাকার গ্রিন লাউঞ্জে জারি করা এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি উত্থাপিত হয়।


সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় যে, প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে। ২০২০ সালে কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আইনের আওতায় প্রকল্পটি অনুমোদন প্রাপ্ত হয় এবং ২০২১ সালে বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও সিএমইসির মধ্যে চুক্তির স্বাক্ষর হয়। তবে, চুক্তির সাড়ে চার বছর পরেও প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।


প্রকল্পের জন্য আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের পাশাপাশি এলাকার ২০ একর জমি এবং ১০ একর স্থানীয় জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ জমি মালিক জমি দিতে রাজি না থাকলেও প্রভাবশালী মহল দ্বারা জমি দখল করে সরকারকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া আদালতে মামলার চলাকালীন জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার ফলে অনেক ভূমি মালিক মর্যাদাপূর্ণ ক্ষতিপূরণ না পেয়ে জমি হারিয়েছেন। প্রায় দুই হাজার মানুষের জীবিকা এই ল্যান্ডফিলের ওপর নির্ভরশীল। তবে, পুনর্বাসনের তালিকায় মাত্র ৪০ জনকে রাখা হয়েছে।


বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতার (পিএলএফ) ভিত্তিতে চললে প্রতি বছর ৩১ কোটি ৬৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এ হিসাবে, সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ২১.৭৮ সেন্ট (২৬.৭৯ টাকা) দামে বিদ্যুৎ ক্রয় করবে, যা সৌরবিদ্যুতের দরের আড়াই গুণ এবং কয়লা-বিদ্যুতের দ্বিগুণ। পিএলএফ ৪০ শতাংশে নেমে গেলে প্রতি ইউনিটের দাম হবে ৪৭ টাকা। যদি পিএলএফ ২০ শতাংশে কমে আসে, তবে প্রতি ইউনিটের দাম দিতে হবে অন্তত ৭৫ টাকা। ফলে বছরে সরকারের ওপর নতুন ৫৮.৮৭ মিলিয়ন ডলার (৭২৪ কোটি ২০ লাখ টাকা) ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ পরবে।


প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণে ৪৬৭ মিলিয়ন ডলার (৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা) খরচ হবে। প্রতি মেগাওয়াটে খরচ হবে ১৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ খরচের প্রায় আড়াই গুণ (প্রতি মেগাওয়াট ৪৭ কোটি টাকা)।


অন্যদিকে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) ১০০ মিলিয়ন ডলার (১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা), নয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এনডিবি) ১০০ মিলিয়ন (১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা) ঋণ এবং সিএমইসি ১৫৭ মিলিয়ন (১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করছে। তবে, বাকি ১১০ মিলিয়ন ডলার (১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা) কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে তা কখনোই উন্মুক্ত করা হয়নি, যা প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।


এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতিদিন ৩ হাজার টন নগরবর্জ্য সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদি কোন কারণে পর্যাপ্ত নগরবর্জ্য সরবরাহ করা না যায়, তাহলে প্রতি টনের জন্য ৫০ মার্কিন ডলার (৬ হাজার ১৫০ টাকা) জরিমানা দিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৭৫০ টন নগরবর্জ্য উৎপন্ন হয়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সিটি করপোরেশনকে আরো বেশি বর্জ্য উৎপাদন করতে হবে। অন্যথায় জরিমানার সম্মুখীন হতে হবে। এর এ কারণে, পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে ঢাকাবাসীদের নোংরা জীবনযাপনে প্ররোচনা দিচ্ছে এই প্রকল্প।


বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরো মাত্রায় চললে ৭৩ হাজার ৫৭৬ টন বটম অ্যাশ, ফ্লাইঅ্যাশ ও অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা, ৩৯.৫৬ টন বিষাক্ত গ্যাস (ভারি ধাতু, ডায়োক্সিন ও ফুরান গ্যাস) এবং ১.১৭ টন ক্ষতিকর গ্যাস (নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড) ঢাকার বাতাসে মিশে যাবে, যা প্রতি বছর ক্যান্সার, হৃদরোগ, বক্ষব্যাধি ও অ্যাজমার প্রকোপ বৃদ্ধি করবে। দিল্লির বর্জ্য-বিদ্যুৎকেন্দ্র বায়ুদূষণ কমানোর চেয়ে বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



আরও পড়ুন: রাঙামাটিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন

প্রকল্পটি নিয়ে বলা হচ্ছে, ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ কমবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্জ্য পোড়িয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১.৩ থেকে ১.৮ কেজি কার্বন নির্গমন ঘটে, যা কয়লা-বিদ্যুতের প্রায় দ্বিগুণ ও গ্যাস-বিদ্যুতের তিনগুণ। প্রকল্পটি পুরো মাত্রায় চললে নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ৪ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে, যার সরাসরি প্রভাববিধান হবে ঢাকার নগরবাসীর ওপর এবং এটি দেশের মোট কার্বন নির্গমন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।


বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নীতি সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোনোর পরিকল্পনা করছে, তখন একটি ব্যয়বহুল ও দূষণকারী প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকের বিনিয়োগ গ্রহণযোগ্য নয়। এআইআইবি ও এনডিবির উচিত অবিলম্বে এই প্রকল্প থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহার করা।’


এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকের (এআইআইবি) পরিবেশগত ও সামাজিক নীতি (ইএসএফ) অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় জনসাধারণের স্বাধীন মতামত নেওয়া উচিত। প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) অনুযায়ী স্থানীয় শতাধিক মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে বললেও, প্রায় ৪০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে কোনো মতামত নেয়া হয়নি। এছাড়াও যাদের কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে মতামত নেয়া হয়েছিল, সেটাও করা হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের প্রকল্প অনুমোদনের পরে।


তবে, এআইআইবির পরিবেশ ও সামাজিক নীতিমালা অনুসারে স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ, তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করলেও প্রকল্পে এসব শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়নি। বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় ১ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে বর্জ্য পোড়ানোর বাধ্যবাধকতা ঘোষিত রয়েছে, কিন্তু গত ১৬ এপ্রিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় আইন সংশোধন করে সিএমইসির জন্য ৮৫০ ডিগ্রি অনুমোদনের প্রস্তাব দিয়েছে।


বিজ্ঞান ও মানবিকতার স্বার্থে, বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্পের মেয়াদ, জাতীয় অর্থনীতি ও ঢাকা মহানগরীর ওপর দৃঢ় নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনা করে নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করতে হবে।


ঢাকা মহানগরের বর্জ্য বাছাই করে শিল্পখাতে পুনর্ব্যবহার ও জৈবসার তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে, যাতে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পাশাপাশি ভূমির স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরিয়ে আনা যায়।


বর্জ্য হ্রাসে নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কৌশল গড়ে তুলতে হবে।


আরও পড়ুন: ভাড়াটে খুনি দিয়ে সাবেক স্ত্রীকে হত্যা, জামায়াত নেতা কারাগারে

বর্জ্য-সংগ্রহকারীদের জীবিকা হারানো এ অবস্থায় তাদের জন্য পর্যাপ্ত ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।


সেইসাথে, বিক্রি করতে অযোগ্য জমির মালিকদের জমি ফেরত প্রদান করতে হবে এবং যারা জমি দিয়েছেন, তাদের কাছে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।


ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পর্কিত এআইআইবি ও এনডিবির ঋণ বাতিল করতে হবে। এবং বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারিত করার জন্য নবায়নযোগ্য নির্বাচিত অর্থায়নকে মান্যতা প্রদান করা উচিত।


নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প শুধুমাত্র একটি ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, পাশাপাশি এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জলবায়ুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সৃষ্টি করবে। তাই, প্রকল্পটি বাতিল করে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন, জৈবসার উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিকল্প কর্মসূচি গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানানো হয়।


News Link: নর্থ ঢাকা বর্জ্যবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের আহ্বান তিন সংগঠনের

bottom of page