

Aug 12, 2026
| হাসান মেহেদী
২০১৮ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশ সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর ও সরবরাহের মাধ্যমে গ্যাসের ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। এলএনজি ক্রয়, রূপান্তর, সঞ্চালন ও সরবরাহে এমন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় যে জনসাধারণের পক্ষে তা ধরা মুশকিল হয়ে পড়ে। একটা উদাহরণ ব্যবহার করলে এলএনজি আমদানি ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া কী, এতে লাভ বা ক্ষতি কী, তা সহজ হয়ে যেতে পারে।
গত ৮ আগস্ট, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আরামকো ট্রেডিং (সিঙ্গাপুর) থেকে প্রতি মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ২১ দশমিক ৫৫ মার্কিন ডলার দরে এক কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর আগের দিন, সিসিজিপি একই দরে ব্ল্যাককিউব ইন্টারন্যাশনাল (যুক্তরাজ্য), গ্লোবাল ফুয়েল সাপ্লাইস (অস্ট্রেলিয়া), ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল (ওমান) এবং প্লেনটিটিউড এনার্জি (মালয়েশিয়া) থেকে আট কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়।
এলএনজি বাণিজ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নানান জটিল একক ব্যবহার করে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলোতে এলএনজি’র পরিমাণ মিলিয়ন টনে নির্ধারণ করা হলেও দর নির্ধারণ করা হয় এমএমবিটিইউ হিসাবে। অন্যদিকে সংরক্ষণ সরবরাহের ক্ষমতা সাধারণত বিলিয়ন ঘনফুটে (বিসিএফ) উল্লেখ করা হয়। আবার বিক্রির সময় গ্রাহকদের কাছ থেকে ঘনমিটার হিসাবে দাম নেওয়া হয়। এখানেই একটি বড় জটিলতা তৈরি হয়।
একটি কার্গো থেকে আমরা কতটা গ্যাস পাই
এলএনজি আমদানির অর্থনৈতিক প্রভাব জানার জন্য প্রতি কার্গো এলএনজি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত গ্যাসের পরিমাণ খতিয়ে দেখা অপরিহার্য। এমএমবিটিইউ দিয়েই শুরু করা যাক। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি থেকে প্রায় ১ হাজার ঘনফুট (২৮ দশমিক ৩২ ঘনমিটার) গ্যাস পাওয়া যায়। একটি কার্গোতে সাধারণত ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি থাকে। ফলে এক কার্গো এলএনজি থেকে মোটামুটি ৯ কেটি ৫১ লাখ ঘনমিটার গ্যাস পাওয়া যায়।
এবার তরল এলএনজি বায়বীয় গ্যাসে রূপান্তর করতে হবে। এই রূপান্তরের সময় প্রায় শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ বাতাসে উবে যায়। ফলে প্রতিটি কার্গো থেকে গড়ে এক লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার গ্যাস উবে যায়। অবশিষ্ট ৯ কোটি ৫০ লাখ ঘনমিটার গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনে আসে। সঞ্চালন পাইপলাইন থেকে যায় বিতরণ কোম্পানির কাছে। পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন অনুসারে, গত দুই দশকে সঞ্চালনের সময় ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ গ্যাস নষ্ট হয়েছে। সুতরাং প্রতি কার্গো এলএনজি থেকে ৩০ লাখ ৭০ হাজার ঘনমিটার গ্যাস নির্গত হয় এবং বিতরণকারী সংস্থাগুলো ৯ কোটি ১৯ লাখ ৩০ হাজার ঘনমিটার গ্যাস পায়।
মোট খরচ কত?
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুসারে এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের দিন প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা। এ হিসাবে প্রতি এমএমবিটিইউ’র দাম পড়ে ২ হাজার ৬৬৮ টাকা। সুতরাং এক কার্গো এলএনজির মোট মূল্য দাঁড়ায় ৮৯৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এছাড়া এলএনজি আমদানিতে ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ও সাড়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম কর দিতে হয়। এ বাবদ খরচ ৮৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সুতরাং এক কার্গো এলএনজির আমদানি খরচ দাঁড়াল ৯৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
এলএনজি আমদানির পর টার্মিনালের মাধ্যমে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। এক্সেলারেট এনার্জি এবং সামিট গ্রুপ পরিচালিত দুটি এলএনজি টার্মিনাল দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট (৩ কোটি ১২ লাখ ঘনমিটার) গ্যাস রূপান্তর করতে পারে। সুতরাং ৯ কোটি ৫০ লাখ ঘনমিটার গ্যাস রূপান্তরে কমপক্ষে তিন দিন লাগে। দুটি এলএনজি টার্মিনাল মিলে প্রতিদিন ৪ লাখ ৫৪ হাজার মার্কিন ডলার টার্মিনাল ফি নিয়ে থাকে। ফলে এক কার্গো এলএনজি গ্রহণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করায় খরচ হবে ১৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা ১৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি কার্গো এলএনজি সঞ্চালন, ব্যবস্থাপনা ও বিতরণের জন্য মোট ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ফি নেয়, যার মধ্যে প্রতি ঘনমিটারে আরপিজিসিএল শূন্য দশমিক ১০ টাকা, জিটিসিএল ১ দশমিক শূন্য ২ টাকা, পেট্রোবাংলা শূন্য দশমিক ০৬৮৩ টাকা এবং বিতরণ কোম্পানিগুলো গড়ে শূন্য দশমিক ২১ টাকা ফি নেয়। গ্যাসে রূপান্তরের খরচের সঙ্গে সঞ্চালন, ব্যবস্থাপনা ও বিতরণের ব্যয় যোগ করলে এক কার্গো এলএনজির মোট খরচ দাঁড়ায় ১ হাজার ১২ কোটি ৯ লাখ টাকা। যদি এ পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটারের (ইউনিট) খরচ দাঁড়াবে ১১০ টাকা ৯ পয়সা।
এবার বিদ্যুৎ বিতরণ। বিতরণ পর্যায়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ উৎস কর ও ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দিতে হয়। এ বাবদ ১৫৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা যোগ করার পর প্রতি কার্গো এলএনজির জন্য মোট খরচ হয় ১ হাজার ১৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এই খরচে ৯ কোটি ১৯ লাখ ৩০ হাজার ঘনফুট গ্যাস ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করা হলে আমদানিকৃত প্রতি ইউনিট গ্যাসের চূড়ান্ত মূল্য দাঁড়ায় ১২৭ টাকা ২৭ পয়সা।
কোন খাতে কতটুকু গ্যাস?
এক কার্গো এলএনজির ৯ কোটি ১৯ লাখ ৩০ হাজার ঘনমিটার আমদানিকৃত গ্যাস আটটি প্রধান খাতে বিতরণ করা হয়। বিদ্যুৎ খাত সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ (৩ কেটি ৮০ লাখ ঘনমিটার) গ্যাস পায়। এরপর শিল্প খাত ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ (১ কোটি ৭৪ লাখ ঘনমিটার), ক্যাপটিভ পাওয়ার ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ (১ কোটি ৫৩ লাখ ঘনমিটার) এবং আবাসিক খাত ১০ দশমিক ৯ শতাংশ (৯৯ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার) গ্যাস গ্রহণ করে। অবশিষ্ট গ্যাস থেকে সার উৎপাদনে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ (৫৭ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার), সিএনজি খাতে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ (৪৪ লাখ ১০ হাজার ঘনমিটার), বাণিজ্যিক খাতে শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ (৮ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার), চা প্রক্রিয়াকরণ খাতে শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ (১ লাখ ঘনমিটার) এবং অন্যান্য খাতে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ (৯০ হাজার ঘনমিটার) বিতরণ করা হয়।
পেট্রোবাংলার লাভ-লোকসান কত?
পেট্রোবাংলা ভিন্ন ভিন্ন খাতে ভিন্ন ভিন্ন দরে গ্যাস বিক্রি করে। ওপরের বিবরণ অনুসারে এক কার্গো গ্যাস সরবরাহ করা হলে বিদ্যুৎ খাত থেকে ৫৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা (১৫ দশমিক ৫০ টাকা প্রতি ইউনিট), শিল্প খাত থেকে ৫২ কোটি ১৫ লাখ টাকা (৩০ টাকা প্রতি ইউনিট), ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্ট থেকে ৪৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা (৩১ দশমিক ৫০ টাকা প্রতি ইউনিট), আবাসিক খাত থেকে ১৭ কোটি ৯৬ কোটি টাকা (১৮ টাকা প্রতি ইউনিট), সিএনজি থেকে ১৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা (৩৫ টাকা প্রতি ইউনিট), সার কারখানা থেকে ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা (১৬ টাকা প্রতি ইউনিট), বাণিজ্যিক খাত থেকে ২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা (৩০ দশমিক ৫০ টাকা প্রতি ইউনিট), চা বাগান থেকে ১২ লাখ টাকা (১১ দশমিক ৯৩ টাকা প্রতি ইউনিট) এবং অন্যান্য খাত থেকে ৩২ লাখ টাকা (৩৫ টাকা প্রতি ইউনিট) আয় করতে পাারে। সব মিলিয়ে, গ্রাহকদের কাছে এক কার্গো রূপান্তরিত এলএনজি বিক্রি করে পেট্রোবাংলার আয় হবে ২০৫ কোটি ১ লাখ টাকা।
গ্যাস রূপান্তর, সঞ্চালন, পরিচালন ও বিতরণসহ এক কার্গো এলএনজির মোট খরচ ১ হাজার ১২ কোটি ৯ লাখ টাকা, যেখানে বিক্রি থেকে মোট আয় ২০৫ কোটি ১ লাখ টাকা। ফলত প্রতি কার্গোতে পেট্রোবাংলার নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০৭ কোটি ৮ লাখ টাকা। স্পট মার্কেটের দাম নিয়মিত ওঠানামা করে। তারপরও প্রতি এমএমবিটিইউয়ের দাম মাত্র ১৩ মার্কিন ডলারে নেমে এলেও প্রতি ইউনিটে খরচ হবে ৬৮ টাকা ১৯ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য দাঁড়াবে ৭৮ টাকা ৮২ পয়সা।
বিদ্যুৎকেন্দ্র শিল্প খাতের বয়লার ও সার কারখানায় জ্বালানি-দক্ষতা কম হলেও, সাধারণ হিসাবের জন্য যদি ৫০ শতাংশ জ্বালানি-দক্ষতা ধরে নিই, তাতে এই গ্যাস থেকে প্রায় ৪৮ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। রুফটপ সোলার থেকে প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪০ পয়সা দরে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে খরচ হবে ৩৫৫ কোটি টাকা। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে এই পরিমাণ গ্যাস উৎপাদনে সর্বোচ্চ খরচ ৬৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা (প্রতি ঘনমিটার ৭ টাকা ২০ পয়সা)। এক কার্গো এলএনজির পরিবর্তে সমপরিমাণ দেশীয় গ্যাস ব্যবহার করলে পেট্রোবাংলা উল্টো ১৩৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করতে পারে।
অবিলম্বে যে পদক্ষেপগুলো নিতে হবে
রাতারাতি এতগুলো জটিল সমস্যা সমাধান করা কার্যত অসম্ভব। সমস্যাগুলো দূর করতে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। তবে দুই বছরে সমস্যাটা মোটামুটি দূর করা সম্ভব। কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সরকারকে দ্রুত একাধিক কঠোর ও অপ্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এসব পদক্ষেপ জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়তা করার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনে ছাড় না দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা করবে।
কঠোর ও অপ্রিয় উদ্যোগগুলোর মধ্যে প্রথমত, আবাসিক খাতে বোতলজাত এলপিজি ব্যবহার ও বৈদ্যুতিক রান্নায় উৎসাহিত করার জন্য পাইপলাইনে গ্যাস বিতরণ বন্ধ করা; দ্বিতীয়ত, শিল্প কারখানার বয়লার গ্যাস থেকে বিদ্যুতে রূপান্তর করতে এবং কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করার জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়নের ব্যবস্থা করা; তৃতীয়ত, ব্যাপকভাবে গৃহস্থালি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের কর্মসূচি নেওয়া; এবং চতুর্থত, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য একটি বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করা।
এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়ন করলে গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমে যাবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত ২ বিলিয়ন ডলারের একটি আবর্তনশীল তহবিল প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে ২০ হাজার টাকা ভর্তুকি প্রদান করা দরকার। এছাড়া সবার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রাংশের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক ও কর বিলোপ করা অপরিহার্য। একইসঙ্গে বিশেষায়িত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাও জরুরি।
সদস্য সচিব, বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও জ্বালানিবিষয়ক কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)
News Link: বাংলাদেশে এলএনজি আমদানির অর্থনৈতিক প্রভাব