

Aug 16, 2026
| হাসান মেহেদী
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ইজিবাইকের ওপর আবারও খুব চটেছে শহুরে নাগরিক সমাজ। এমনকি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীও গত ১৪ আগস্ট সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বলেন, ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার কারণে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ‘হঠাৎ’ বেড়ে গেছে (দৈনিক আমার দেশ)। এই দিনই আরেকটি সংবাদমাধ্যম এক অদ্ভুত তথ্য দেয়। ৬০ লাখ অটোরিকশায় চার্জ দিতে নাকি বছরে ৩ লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দরকার হয়। সংখ্যাটি হয়তো ৩ লাখ মেগাওয়াট-ঘণ্টা হবে; কারণ গ্রিডযুক্ত, বিযুক্ত, আমদানি ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে আমাদের বিদ্যুৎ খাতে মোট সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট (বিপিডিবি, ১২ আগস্ট ২০২৬), ৩ লাখ মেগাওয়াট দূর কি বাৎ!
কিন্তু ৩ লাখ মেগাওয়াট-ঘণ্টার হিসাবটিও হয়তো ভুল। বিপিডিবির হিসাব অনুসারে দেশে মোট ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ লাখ (বণিক বার্তা)। যুক্তির খাতিরে বিপিডিবির পরিসংখ্যান সত্যি বলেই ধরে নিই। প্রতিটি অটোরিকশায় গড়ে ৪টি ১২ ভোল্ট ও ১০০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ব্যাটারি থাকে। ফলে একটি অটোরিকশা দৈনিক ৩ দশমিক ৮৪ ইউনিট বিদ্যুৎ নিতে পারে। তাহলে ৫০ লাখ অটোরিকশা বছরে ৫৬১ কোটি ইউনিট বা ৫৬ লাখ ৬ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ১০ হাজার ৫৮৪ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে (বিপিডিবি রেকর্ড)। এর অর্থ হলো, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা উৎপাদিত বিদ্যুতের মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যবহার করে।
প্রথমত, এই অটোরিকশা হঠাৎ করে বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু করেনি। ২০২৩-২৪ সালে মোট অটোরিকশার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ লাখ। তখনও এগুলো বিদ্যুতেই চলতো। এখানেই ‘হঠাৎ করে’ বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধির তত্ত্বটি মার খেয়েছে। দ্বিতীয়ত, মাত্র ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে আড়াই থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট (১৫ থেকে ১৯ শতাংশ) লোডশেডিং হচ্ছে এটা অবিশ্বাস্য। এ জন্যই উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে না চাপিয়ে খোলামনে বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা হওয়া দরকার। বাস্তব সমস্যা হলো জ্বালানি সংকট। তারও পেছনের সমস্যা হলো ভবিষ্যতের সংকট দেখতে পেয়েও যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা। গত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ব্যাপক আকারে গৃহস্থালি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বসাতে পারলে জুলাই-আগস্ট মাসে এতটা সংকট দেখতে হতো না। সামান্য নীতিগত সহায়তা আর ব্যাপক প্রচার চালালে সাধারণ মানুষই বিনিয়োগ করে নিজস্ব বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারত।
ফিরে আসি অটোরিকশা প্রসঙ্গে। অটোরিকশা চার্জ দেওয়ায় যে ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় তার অর্থনৈতিক ফলাফল কী সেটা জানলে অবাক হয়ে যেতে হয়। একজন অটোরিকশা ড্রাইভার প্রধান শহরগুলোয় দৈনিক ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং মফস্বলে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন। বছরে লেনদেন প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় অর্থনীতিতে এর ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি কখনই। এই আয়ের প্রায় অর্ধেক যায় গ্যারেজ ভাড়া, অটোরিকশা ভাড়া ও চার্জিং ফি বাবদ। বাকি অর্ধেক টাকা দিয়ে ড্রাইভারের সংসার চলে। এক একটি অটোরিকশার নির্মাণ থেকে শুরু করে পরিচালন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিনজন শ্রমিকের কর্মসংস্থান। ৫০ লাখ অটোরিকশার সঙ্গে তাহলে প্রায় দেড় কোটি শ্রমিক ও তাদের পরিবারের ভরণপোষণ যুক্ত। অটোরিকশা বন্ধ করে দিলে এই বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থানের কী হবে?
একটি অটোরিকশা একবার চার্জ দিয়ে মোটামুটি ২৪ কিলোমিটার চলতে পারে। ফলে প্রতি কিলোমিটার চলতে শূন্য দশমিক ১৬ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয় যার দাম ২ দশমিক শূন্য ৯ টাকা। এই একই দৈর্ঘ্যের পথ ডিজেলচালিত বাস চালালে ২৩ টাকা, পেট্রলচালিত প্রাইভেটকার চালালে ১১ দশমিক ৬৭ টাকা এবং তিন চাকার সিএনজি চালালে ২ দশমিক ৩৯ টাকা খরচ হয়। সিএনজি অটোরিকশা অনেকটা সস্তা হলেও গ্যাসের আকালে তা চলছে না বলাই বাহুল্য।
এবার বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কথা বলা যাক। একটি অটোরিকশা চার্জ দিতে মাসে মোটামুটি ১১৫ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। প্রতি ইউনিট ১১ দশমিক ৩৬ টাকা দরে মিটার চার্জ, ডিম্যান্ড চার্জ ও ভ্যাটসহ মোট মাসিক বিল হবে ১ হাজার ৫০৪ টাকা। সমপরিমাণ বিদ্যুৎ গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করলে মাসিক বিল হবে ১ হাজার ১১০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রতিটি অটোরিকশা সরকারকে ৩৯৪ টাকা অথবা বছরে ৪ হাজার ৭২৭ টাকা বেশি বিদ্যুৎ বিল দেয়। অটোরিকশার সংখ্যা ৫০ লাখ হলে সরকার অতিরিক্ত পায় ২ হাজার ৩৬৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সুতরাং শুধুমাত্র অটোরিকশা খাত বিদ্যুৎ বিভাগের ২ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমাতে সহায়তা করে।
এমন কথাও উঠেছে যে, অটোরিকশাগুলো অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়া হয়। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিতরণ-ব্যবস্থায় বর্তমানে সিস্টেম লসের হার ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ (বিপিডিবি ২০২৫)। সিঙ্গাপুর ও জাপানের মতো দেশে এ হার মোটামুটি ৪ শতাংশ। আমাদের দেশের বিতরণ-ব্যবস্থার মান বিবেচনায় নিলে এ হার সিঙ্গাপুরের চেয়ে ২ থেকে আড়াই শতাংশ বেশি হওয়া যুক্তিযুক্ত। তবু যুক্তির খাতিরে যদি ধরে নিই, বিতরণ লাইন থেকে অবৈধভাবে অটোরিকশা ব্যাপকভাবে চার্জ দেওয়া হয় তবে কি অটোরিকশার চালকদের দোষ দেওয়া যায়? অবৈধ সংযোগের সঙ্গে যুক্ত বিতরণ কোম্পানির স্থানীয় মিটার রিডার, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও গ্যারেজ মালিকরা। এ তিন গোষ্ঠীর দুর্নীতিতে রিকশাচালক শুধু পরিশোধকারী, সেবা গ্রহণকারী নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গণপরিবহন। এসব অটোরিকশা হঠাৎ করে বাজারে আসেনি। উপযুক্ত গণপরিবহনের অনুপস্থিতিতে নসিমন-করিমনের মতোই সাধারণ মানুষ অটোরিকশা আবিষ্কার করেছে। প্রতিটি অটোরিকশায় প্রতিবার চার থেকে পাঁচজন যাত্রী চলাচল করতে পারে। দৈনিক মাত্র ১০ জন যাত্রী পরিবহন করলেও এসব অটোরিকশায় দৈনিক ৫ কোটিরও বেশি মানুষ যাতায়াত করে। গত ৫৫ বছরে সরকার এমন কোনো বিকল্প গণপরিবহন চালু করেনি যা এই বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত নিশ্চিত করতে পারে। বিকল্প গণপরিবহনের ব্যবস্থা না করে প্রচলিত গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তাটাই অবাস্তব।
আরও কিছু সংবাদ শিরোনাম দেখলে মনে হয়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দূর হয়ে গেলে দেশের সড়ক যোগাযোগ-ব্যবস্থা স্বর্গতুল্য হয়ে যাবে। কিন্তু পরিসংখ্যানে ঠিক উল্টোচিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৪৯০ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে ৩৭ শতাংশের জন্য মোটরসাইকেল দায়ী। অন্যান্যের মধ্যে রয়েছে ট্রাক ও লরি (২৩ শতাংশ), বাস ও মিনিবাস (১৫ শতাংশ), ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা (১৪ শতাংশ), ছোট বাণিজ্যিক যানবাহন (৮ শতাংশ) ও সিএনজি অটোরিকশা (৭ শতাংশ)। দুর্ঘটনা রোধ করতে চাইলে সবার আগে মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করা দরকার— অটোরিকশা নয়।
এই সংকট থেকেই আমাদের সম্ভাবনার দিকে যেতে হবে। এ কথা অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে, অটোরিকশা চালানোর জন্য সড়ক নির্দিষ্ট করে দেওয়া দরকার। বিশেষত মহাসড়ক ও দ্রুতগামী সড়কে অটোরিকশা চলতে দেওয়া উচিত হবে না। সাধারণ রিকশার মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশারও লাইসেন্স থাকা উচিত। অটোরিকশা মালিকদের করের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এছাড়া অটোরিকশার জন্য টেকসই নকশা প্রণয়ন করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগও তৈরি করতে হবে। তাই বলে বেসরকারি কোম্পানির আমদানীকৃত উচ্চমূল্যের অটোরিকশা বাজারে চালানোর জন্য এসব গরিব মানুষকে রাস্তা থেকে হঁটিয়ে দেওয়া অন্যায় হবে।
দেশজুড়ে বিস্তৃত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পেট্রল পাম্প এবং প্রায় ১ হাজার এলপিজি রিফুয়েলিং স্টেশনে কোনো নতুন লাইসেন্স ছাড়া সৌরবিদ্যুতে চালিত চার্জিং স্টেশনে রূপান্তরের অনুমোদন দিলে এসব অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে দেশে ইলেকট্রিক যানবাহনের সংখ্যাও দ্রুত বাড়বে যা চূড়ান্ত বিচারে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের চাহিদা কমাবে। দ্রুত চার্জ দেওয়ার জন্য একদিকে লিথিয়াম-আয়রন ব্যাটারি অন্যদিকে আধুনিক চার্জিং মেশিনের আমদানি শুল্ক ও কর মওকুফ করতে হবে যা আখেরে জাতীয় অর্থনীতিই বাঁচাবে।
এ ধরনের উদ্যোগ যত দ্রুত নেওয়া যাবে ততই দেশের জ্বালানি সংকট কমে আসবে। শুধু শুধু দরিদ্র অটোরিকশা চালকদের দোষ দিয়ে দেশের কোনো উপকার হবে না।
সদস্য সচিব, বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)
News Link: ব্যাটারিচালিত রিকশা নয়, বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ জ্বালানি ঘাটতি